পুণ্যভূমি ডেক্স
সেপ্টেম্বর / ১৭ / ২০২৬
সিলেট নগরীর বুক থেকে এবার সরে যাচ্ছে পুরোনো কারাগারের দেয়াল। সেই জায়গায় গড়ে উঠবে নান্দনিক পার্ক। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচেষ্টায় নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জমি সিসিকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এমপি।
সভায় শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, কারা মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিনের আবদ্ধ জায়গা এবার হবে উন্মুক্ত: সিলেট নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখানে পার্ক নির্মাণের জন্য বাদাঘাটে কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এখানে পার্ক নির্মাণ না করে উঁচু দেয়ালের ভেতরেই আবদ্ধ করে রাখা হয় বিশাল এই নগরভূমিকে। এবার সেই জায়গাই উন্মুক্ত হবে নগরবাসীর জন্য। এখানে থাকবে সবুজের সমারোহ। থাকবে হাঁটার পথ। থাকবে নির্মল বাতাসে স্বস্তির পরিসর। নগরীর ব্যস্ত জীবনে কিছুটা প্রশান্তির জায়গা হবে এই পার্ক।
সিলেটকে গ্রিন ও ক্লিন, নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রত্যয় নেওয়া হয়েছে, নতুন এই পার্ক সেই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদাও ছিল এমন একটি উন্মুক্ত স্থান। যেখানে শিশু-কিশোররা সময় কাটাতে পারবে। বয়স্করা হাঁটতে পারবেন। পরিবার নিয়ে মানুষ কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন।
উদ্যোগে এমপি ও সিটি প্রশাসক: পুরোনো কারাগারের স্থানে একটি নান্দনিক বিনোদন পার্ক নির্মাণ ছিল স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে নগরবাসীকে এই জায়গায় পার্ক নির্মাণের কথা বলেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর লক্ষ্য ছিল নগরবাসীর জন্য একটি উন্মুক্ত ও সবুজ পরিসর তৈরি করা। যেখানে মানুষ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবেন। নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারবেন। পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে পারবেন।
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি এবং সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বরাবর আধা-সরকারি (ডিও) পত্র দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে।
কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভূমিটি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়।
বৃহস্পতিবারের সভায় সেই প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপর পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের জন্য ভূমিটি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরোনো কারাগারের এই জায়গায় সিটি করপোরেশন কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে না। অর্থাৎ, নগরবাসীর জন্য নির্ধারিত এই জায়গার মূল উদ্দেশ্য থাকবে জনকল্যাণ ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কারাগারের সব বন্দিকে বাদাঘাটে অবস্থিত কারাগারে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২’ নামে আরেকটি কারাগার নির্মাণ করা হবে।
এক পাশে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: নান্দনিক পার্কের পাশাপাশি এখানে নির্মাণ করা হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ফলে জায়গাটি শুধু বিনোদনের কেন্দ্র হবে না। হয়ে উঠবে ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। একদিকে থাকবে সবুজের প্রশান্তি। অন্যদিকে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার স্মারক। নতুন প্রজন্ম এখানে বিনোদনের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে তাদের পরিচয় আরও গভীর হবে।
সিসিক প্রশাসকের কৃতজ্ঞতা:
পুরোনো কারাগারের জায়গায় পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের জন্য ভূমিটি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সিসিক প্রশাসক বলেন, “নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। পুরোনো কারাগারের জায়গায় নান্দনিক পার্ক হবে। এক পাশে হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।”
তিনি জানান, অচিরেই পার্ক ও জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। কারাগারের সব বন্দিকে বিদ্যমান কারাগারে স্থানান্তরের পর পুরো জায়গাটি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ পার্কে রূপ দেওয়া হবে।
নগরবাসীর জন্য নতুন এক স্বস্তির ঠিকানা: পুরোনো কারাগারের এই জায়গাটি এতদিন ছিল উঁচু দেয়ালে ঘেরা। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও জায়গাটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। সেই চিত্র এবার বদলাতে যাচ্ছে। কারাগারের দেয়ালের জায়গায় উঠবে সবুজ। বন্দিত্বের জায়গায় তৈরি হবে উন্মুক্ত পরিসর। ইট-কংক্রিটের নগরীতে যোগ হবে প্রশান্তির নতুন ঠিকানা। সিলেট নগরবাসী সেখানে হাঁটবেন। শিশুরা খেলবে। পরিবার নিয়ে মানুষ সময় কাটাবে। প্রবীণরা পাবেন স্বস্তির পরিসর। আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্মরণ করিয়ে দেবে একটি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস।
একটি পুরোনো কারাগারের জমি তাই কেবল একটি পার্কে রূপান্তরিত হচ্ছে না। নগরীর একটি আবদ্ধ অধ্যায়ের জায়গায় তৈরি হচ্ছে মানুষের জন্য উন্মুক্ত ভবিষ্যৎ।