পুণ্যভূমি ডেক্স
মে / ২৭ / ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘ডিটেক্টেড ডিফল্ট হোল্ডিং সেন্টার’ সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা জারি করার পর থেকেই সেখানে অবৈধভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিদের মাঝে নিজ দেশে ফেরার এক মরিয়া তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই অনুপ্রবেশ ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সামনে এনেছিল বিজেপি।
নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর থেকেই অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে চরম সক্রিয় হয়ে উঠেছেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ মে মঙ্গলবার সকালে উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় শত শত নারী-পুরুষ বাংলাদেশে প্রবেশের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। উদ্ভূত এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মঙ্গলবার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “এদের (অনুপ্রবেশকারী) অবিলম্বে চলে যাওয়া উচিত। ওই দেশের মুখপাত্র তো নিজেই বলেছিলেন যে তারা বাংলাদেশিদের ফেরত নেবেন। তাই বলছি জলদি জলদি ভাগো, না হলে এই সরকার আইন অনুযায়ী যা করার ঠিক তা-ই করবে।”
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, রাজ্যে অবৈধভাবে থাকা অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রেখে আদালতের দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ায় পাঠানোর কোনো প্রয়োজন নেই। দেশের প্রচলিত আইনেই এর সমাধান রয়েছে। এখন থেকে পুলিশ সরাসরি এই অনুপ্রবেশকারীদের আটক করবে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী তথা বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে। এরপর বিএসএফ ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রমাণ করে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অনুপ্রবেশকারীদের চাপের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, “আমাদের রাজ্যের জেলে তিন মাস, ছয় মাস কিংবা দুই বছর রেখে আমাদের চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম, কাপড় আর ওষুধ আমরা ওদের পেছনে কেন খরচ করব? এতে তো সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদেরই ক্ষতি হচ্ছে। এই আইনটি দেশে অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু বিগত দিনে রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নিজেদের ভোট ব্যাংকের স্বার্থে এটি প্রয়োগ করেনি। তবে আমরা ভোট ব্যাংকের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও রাজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করছি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া মনোভাব এবং রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনার পর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আটককৃত বিদেশি নাগরিক কিংবা ডিপোর্টেশনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলায় জেলায় বিশেষ ‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।
এই নির্দেশ জারি হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মালদার ইংরেজবাজারে প্রথম হোল্ডিং সেন্টারটি চালু করা হয়। এর পরপরই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা মুর্শিদাবাদেও একই ধরনের হোল্ডিং সেন্টার খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর অবস্থান টের পেয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগর থানার বিথারি হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হাকিমপুর চেকপোস্টে মঙ্গলবার সকাল থেকেই শত শত মানুষের সমাগম ঘটে। সীমান্তে জড়ো হওয়া এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় নথিপত্রহীনভাবে বসবাস করার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা আইনি জটিলতা এড়াতে নিজেরাই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
চেকপোস্টে অপেক্ষমাণ কয়েকজন জানান, কিছুদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে বিএসএফ-এর মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছিলেন। সেই ভীতি থেকেই তারা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের এই জমায়েতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অধিবাসী ও প্রশাসনের মাঝে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, এখন সেদিকেই কড়া নজর রাখছে রাজ্য প্রশাসন।