পুণ্যভূমি ডেক্স
জুন / ২৫ / ২০২৬
ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসে ভবন ধস ও দেশের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ডেলসি রড্রিগেজ বুধবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
রড্রিগেজ জানান, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার একই এলাকায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর, অন্তত ২০টি ‘আফটার শক’ অনুভূত হয়েছে।
কারাকাস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
এএফপি’র সাংবাদিকরা জানান, ভূমিকম্পে রাজধানীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে।
৫৪ বছর বয়সী ব্যাংককর্মী ওদালিস এসকালোনা বলেন, ‘সিঁড়ি আলাদা হয়ে গেছে, পুরো দেয়ালে ফাটল ধরেছে।
ছাদ থেকে জিনিসপত্র পড়ে গেছে। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।’
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানান, এখনও কোনো প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন আহত হয়েছেন ও বিভিন্ন ভবন ধসে পড়েছে ।
এএফপি’র এক সাংবাদিক রাজধানীর আলতামিরা এলাকায় একটি ২২ তলা ভবন পুরোপুরি ধসে পড়তে দেখেছেন। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপের ওপর উঠে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিলেন।
এ সময় স্বজনদের নাম ধরে কান্নাকাটি করতে দেখা যায় অনেককে।
এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘আমাদের টর্চলাইট দরকার।’
ইউএসজিএস জানায়, প্রথম ভূমিকম্পটি গ্রিনিচ মান সময় ২২০৪টায় উপকূলীয় শহর মোরনের ২১ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে।
এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত করে।
ইউএসজিএস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এটি ছিল একটি জোড়া ভূমিকম্পের দ্বিতীয় ঘটনা। ৭ দশমিক ৫ মাত্রার প্রধান ভূমিকম্পটির ৩৯ সেকেন্ড আগে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি পূর্বাভাসমূলক কম্পন (ফোরশক) হয়েছিল।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলো জনগণকে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি ভবনের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাস থেকে কোনো ধরণের দুর্ঘটনা ঘটুক, আমরা তা চাই না।’
রড্রিগেজ জানান, কারাকাসের কাছে অবস্থিত মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবকাঠামোর ‘গুরুতর ক্ষতির’ কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।
-‘আমরা বের হতে পারিনি’-
২২ ও ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন এই কম্পনে কারাকাসের একটি শপিং সেন্টারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে চিৎকার-চেঁচামেচির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এএফপির এক সাংবাদিক।
ভূমিকম্পের সময় শপিং সেন্টারের সর্বোচ্চ তলায় থাকা দোকান মালিক হেইদি রোমেরো বলেন, ‘ঘটনাটি অবিশ্বাস্য ছিল। কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, সেটাও বলতে পারব না।’
৪২ বছর বয়সী রোমেরো বলেন, ‘আমরা জরুরি সিঁড়ি দিয়ে বের হয়েছি। সেভাবেই আমাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
রাজধানীর আরও বহু মানুষ ভবন থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় অপেক্ষা করেন। পরে তারা আবার অফিস ও বাসায় ফিরে যান।
৬৯ বছর বয়সী কারমেন গুয়েদেজ তার শয্যাশায়ী বোনের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন। এ সময় তিনি ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি অনুভব করেন।
তিনি বলেন, ‘কম্পন ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। জানালাগুলো নড়তে শুরু করে, তারপর সবকিছু কেঁপে ওঠে।’
মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি, আমার বোন ও এক প্রতিবেশী একসঙ্গে ছিলাম। আমরা বের হতে পারিনি। প্রতিবেশীরা এখনও রাস্তায় অবস্থান করছেন।’
কাবেলো জানান, ত্রুহিয়ো, কারাবোবো, মিরান্দা ও লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
-প্রতিবেশী দেশেও কম্পন-
ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিবেশী কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা পর্যন্ত অনুভূত হয়। সেখানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অ্যালার্ম বেজে ওঠে এবং কিছু বাসিন্দা ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
কলম্বিয়ার জাতীয় ভূকম্পন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফ্রেডি তোভার জানান, দেশজুড়ে দুই শতাধিক কম্পন অনুভূতির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স- প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘এই ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্যের কারণে আরও কিছু পরাঘাত হতে পারে, যা কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায়ও অনুভূত হতে পারে।’
কলম্বিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইউএনজিআরডি জানিয়েছে, এ ঘটনার পর সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই।
মার্কিন জাতীয় সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্রও এক্সে দেওয়া বার্তায় বলেছে, ‘সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কারণে কোনো সুনামি নেই, কোনো বিপদও নেই।’
ভূমিকম্পপ্রবণ ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনগুলোর একটি হয়েছিল ১৯৯৭ সালে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। এতে ৭৩ জন মারা যান। আর ১৯৬৭ সালে কারাকাসে সংঘটিত ভূমিকম্পে প্রাণ হারান ২৩৬ জন।
এদিকে ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ পরই জাপানের উত্তরাঞ্চলে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানায়। তবে সেখানে কোনো হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।