পুণ্যভূমি ডেক্স
এপ্রিল / ২৪ / ২০২৬
ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর বর্তমানে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বর্তমানে তার একটি পা কৃত্রিমভাবে প্রতিস্থাপন বা প্রস্থেটিক করা হতে পারে এবং তার মুখমণ্ডল ও ঠোঁট গুরুতরভাবে পুড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, তার চেহারা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। অনশ্রী জঙ্কোর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংবাদে ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদলের চিত্রও উঠে এসেছে।
মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ইরানের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখন মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জেনারেলদের হাতে চলে গেছে।
সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শীর্ষ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি জানিয়েছেন, মোজতবা বর্তমানে একটি পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকের মতো দেশ চালাচ্ছেন, যেখানে জেনারেলরাই মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করছেন।
ইসরায়েলি ট্র্যাকিং ও সম্ভাব্য হামলা এড়াতে শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা বর্তমানে তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করা বন্ধ করে দিয়েছেন। মোজতবার চিকিৎসার বিষয়টি এখন সরাসরি তদারকি করছেন ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, যিনি নিজে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শারীরিক আঘাত মারাত্মক হলেও মোজতবা খামেনি মানসিকভাবে বেশ সচেতন ও সক্রিয় রয়েছেন। তার একটি পায়ে ইতিমধ্যে তিনবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং একটি হাতের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। তবে তিনি মানসিকভাবে দুর্বল বা ‘ভীত’ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চান না বলে বর্তমানে কোনো মৌখিক বিবৃতি দিচ্ছেন না; পরিবর্তে তিনি কেবল লিখিতভাবে তার বার্তা বা নির্দেশনা জারি করছেন। এই পরিস্থিতির সুযোগে ইরানের শাসন কাঠামোতে আলেমদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং কট্টরপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে সামরিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডসের শীর্ষ নেতা আহমদ ওয়াহিদি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদ্র এখন দেশ পরিচালনায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন।
অন্যদিকে নির্বাচিত সরকার এবং সিভিল প্রশাসনকে অনেকটা কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তার মন্ত্রিসভাকে বর্তমানে কেবল অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের মতো দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত রাখা হয়েছে। এমনকি কূটনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বদলে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামরিক বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডস এখন কেবল রণক্ষেত্রের সিদ্ধান্তই নিচ্ছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং সরাসরি আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়েও তারা সরাসরি অংশ নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো ইরানের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলে শীর্ষ জেনারেলদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যদিও ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র এবং মতপার্থক্য থাকার ঐতিহ্য রয়েছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জেনারেলদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং মোজতবার অসুস্থতা দেশটিকে একটি সামরিক শাসিত কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ইরানের ভবিষ্যৎ এখন মোজতবা খামেনির শারীরিক সুস্থতা এবং পর্দার অন্তরালে থাকা এই সামরিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।