পুণ্যভূমি ডেক্স
জুলাই / ২৮ / ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সামুদ্রিক পথ বাব এল-মান্দেব প্রণালি সহিংস অবরোধের মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে গত ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি খাতে হিমশিম পরিস্থিতি সামলাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী এক বিশ্লেষকের মতে, মজুত কমে যাওয়ায় অনেক দেশ এখন ‘তলানি ঘাঁটছে’।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলার মাঝেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অলিখিত অবরোধ বজায় রেখেছে। সৌদি আরবের কোনো জাহাজকে এই প্রণালি দিয়ে চলতে দিচ্ছে না। বর্তমানে তেল পরিবহনের জন্য কেবল সুয়েজ খাল সচল আছে।
জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের আমদানির ৯০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেনে। তারা এখন সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক এশিয়া গ্রুপের উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল বলছেন, এখন খুব বেশি মজুত নেই। বিশ্বব্যাপী সংরক্ষিত মজুতের সক্ষমতাও প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
মঙ্গলবার দ্য গার্ডিয়ান তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি সরকার তেল রপ্তানির কার্যক্রম ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে যায়। এই বন্দরটি লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী। এখান থেকে তারা মোট অপরিশোধিত তেলের ৭০ শতাংশ রপ্তানি করছে। কিন্তু সম্প্রতি বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদির জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপের পর সরবরাহ সংকট প্রকট হয়েছে।
এই পথটিকে এতদিন এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই পথ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হতো। যুদ্ধবিরতি ভেঙে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় শিগগিরই জলপথটি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই।
হরমুজ ঘিরে নতুন প্রস্তাব
এশিয়াসহ অন্য অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনে এখনও হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ আছে। উভয়পক্ষ আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে।
মঙ্গলবার উপসাগরীয় একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান যাতে হরমুজ দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ফি সংগ্রহ করতে পারে সেটির একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে প্রতিবেশী দেশ ওমান। তারা ওই পরিকল্পনায় উপসাগরীয় দেশগুলোরও সমর্থন পেয়েছে। তেল বাণিজ্যে অচলাবস্থা কাটানোর ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উপসাগরীয় ওই সূত্রটি রয়টার্সকে আরও জানায়, ওমানের প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে না। ফি আদায়ের বিষয়টি স্বেচ্ছাসেবামূলক। অনেকটা এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির মতো। সেখানে নৌচলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা এবং উদ্ধার কার্যক্রমের তহবিল গঠনের জন্য জাহাজগুলোকে স্বেচ্ছায় অনুদান দিতে বলে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর।
ইরান বলেছে, তারা ওমানের সঙ্গে মিলে প্রণালিটি পরিচালনা করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো- বাধ্যতামূলক ফি আদায় করাটা বেআইনি। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি উন্মুক্ত ছিল। সে অবস্থায় ফিরে যাওয়াটাই ভালো সমাধান।
কূটনীতিতে যা চলছে
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব ও ওমানের মন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। এ সময় তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা নিরসনে সহযোগিতা এবং যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান নৌপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এ কারণে জাহাজ চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। গত কয়েকদিনে জ্বালানি সরবরাহের পথকেন্দ্রিক সংঘাত লোহিত সাগরেও ছড়িয়ে পড়েছে।