পুণ্যভূমি ডেস্ক
অক্টোবর / ১৫ / ২০২২
পূর্বাচল নতুন শহরে প্রস্তাবিত আইকনিক টাওয়ার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি বলছে, বিশাল উঁচু এই টাওয়ার নির্মিত হলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজের ওঠানামায় সমস্যা হবে। কোনো কোনো গন্তব্যের উড়োজাহাজকে যেতে হবে প্রচলিত রুট বা পথের বদলে ভিন্ন পথে। এতে নিরাপত্তাঝুঁকির পাশাপাশি জ্বালানির ব্যয়ও বাড়বে বিমান সংস্থাগুলোর। বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকেও এসব সমস্যার কথা জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত আইকনিক টাওয়ার নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে সচিবালয়ে। বেবিচক ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইকনিক টাওয়ারের উচ্চতা নিয়ে আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরেছে বেবিচক। আবার রাজউকও আইকনিক টাওয়ার বানানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এর আগে উচ্চতার ছাড়পত্রের জন্য বেবিচককে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়েছে রাজউক। কিন্তু অ্যাভিয়েশন খাতের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বেবিচক কোনো সাড়া দেয়নি।
গতকালের সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষের কথাই শুনেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছি। আমরা ছাড়া বিমানবাহিনী থেকেও এসব সমস্যার কথা জানানো হয়েছে।’
আইকনিক টাওয়ার বানানোর বিষয়ে রাজউক আন্তরিক বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা। তিনি বলেন, ‘বেবিচক কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা দেখিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্যার সভায় দুই পক্ষের কথা শুনেছেন। পরবর্তী সময়ে আরেকটি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। আমরা আন্তরিক আছি এটার সমাধান করতে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও তৈরি আছে।’
জানা যায়, পূর্বাচলের ১৯ নম্বর সেক্টরে বাণিজ্যিকভাবে আইকনিক টাওয়ার নির্মাণ করার জন্য একটি বেসরকারি কোম্পানিকে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে রাজউক।
বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা শহরে কয়েকটি সংরক্ষিত এলাকা আছে। সেই এলাকাগুলোর দুই হাজার ফুট উচ্চতার মধ্যে উড়োজাহাজ চলতে পারে না। এর মধ্যে আছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিটিভি ভবন এবং সেনানিবাস এলাকার কিছু অংশ। এখন পূর্বাচলে সুউচ্চ আইকনিক টাওয়ার নির্মিত হলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। এর জন্য নতুন করে উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করতে হবে। এতে বাড়বে এয়ারলাইনসগুলোর জ্বালানি খরচ। আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) নিয়ম অনুসারে বিমানবন্দরের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৫০০ ফুটের বেশি উঁচু ভবন তৈরি করা যায় না। বেশি উচ্চতার ভবন তৈরির কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে আইকাওয়ের সদস্যপদও স্থগিত হতে পারে।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. রেয়াদাদ হোসেন বলেন, ‘ঢাকায় বিমানবন্দর ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ফাইটার এয়ারক্রাফটের রানওয়ের কাছাকাছি এলাকার মধ্যে এই আইকনিক টাওয়ার করার কথা বলা হচ্ছে। বেবিচক ছাড়াও এই টাওয়ারের উচ্চতা নিয়ে বিমানবাহিনী আপত্তি জানিয়েছে। আমাদের নিয়ম অনুসারে, পূর্বাচলে সর্বোচ্চ ১৫০ ফুট (১৫ তলা) উচ্চতার ভবন নির্মাণ করতে পারবে। রাজউককে বিষয়গুলো আমরা একাধিকবার অবহিত করেছি।’
বেবিচকের আপত্তি থাকলেও আইকনিক টাওয়ার নিয়ে অতি আগ্রহ দেখা গেছে রাজউক কর্মকর্তাদের। সংস্থাটির নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘শহরের নিজস্ব আইডেনটিটি থাকা উচিত। পৃথিবীর বহু দেশ এমন টাওয়ার নির্মাণ করেছে। আমাদের দেশেও আইকনিক টাওয়ার থাকতেই পারে। আমি মনে করি, এটা দেশের ইমেজ আরও বাড়াবে।’
রাজউক সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি কোম্পানি শিকদার গ্রুপকে আইকনিক টাওয়ার নির্মাণের জন্য এরই মধ্যে ১১৪ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতি একরের দাম ৩০ কোটি টাকা হিসাবে শিকদার গ্রুপের ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রাজউককে। ইতিমধ্যে কোম্পানিটি রাজউককে ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে আরও ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে। তবে আইকনিক টাওয়ারের মূল নকশার অনুমোদন এখনো হয়নি। কারণ এখানে বেবিচক কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে। পরিকল্পনা অনুসারে আইকনিক টাওয়ার নির্মিত হবে তিনটি ভবনের সমন্বয়ে। তা হচ্ছে ১ হাজার ৫৫২ ফুট উচ্চতার ১১১ তলা আইকনিক লিগ্যাসি টাওয়ার, ৭১ তলা স্বাধীনতা টাওয়ার এবং ৫২ তলা ভাষা টাওয়ার।
শিকদার গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘আইকনিক টাওয়ারের উদ্যোগে জাপান, চায়নাসহ অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সমস্যা হয়ে গিয়েছে উচ্চতার ছাড়পত্র পাওয়ার বিষয়ে। প্রকল্প শুরু করার পর আইকনিক টাওয়ারের পুরো কার্যক্রম শেষ করতে সময় লাগবে ৭ থেকে ৮ বছর। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে অবশ্যই আইকনিক টাওয়ার হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে আকাশ পরিবহনে যে রুট ম্যাপ রয়েছে, তা মানতে হবে। বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘ঢাকা বিমানবন্দর এমনিতেই ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন করে ঝুঁকি বাড়ানো উচিত হবে না। এটা এখন শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে গেছে। বিমানবন্দরের কাছের এলাকায় আইকনিক টাওয়ার করতে হলে বিমানবন্দর অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এয়ারলাইনসের যে রুট ম্যাপ আছে, সেটাকে সমীহ করতেই হবে।’
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ‘২০১৬ সালে থেকে আইকনিক টাওয়ার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। টাওয়ারের সবকিছু নির্ধারণ হয়ে গেছে। পরিকল্পনা অনুসারে কাজ শুরু হলে ১১১ তলার আইকনিক টাওয়ার উদ্বোধন করা হবে ২০৩০ সালে বঙ্গবন্ধুর ১১১তম জন্মদিনে।’
পূর্বাচলে আইকনিক টাওয়ার বানানোর মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, ‘আইকনিক টাওয়ার নাম দিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা পূর্বাচল শহরের মূল প্রকল্পের বিরোধী। কারণ আইকনিক টাওয়ারের জন্য যে সুবিধা লাগবে, সেই অবকাঠামো ওখানে নেই। এতে অন্যান্য সুবিধাসম্পন্ন প্লটের সুবিধাদি সংকুচিত হবে। এভাবে নতুন একটি শহর জন্মের আগেই বিপদগ্রস্ত করার কোনো মানে হয় না। তবে এসব বড় প্রকল্পে রাজউকের কর্তাদের অতি উৎসাহ রয়েছে। কেন এত আগ্রহ, এটা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানা লাগে না।